BIniQo AMP
Bank

বাংলাদেশের ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মিলিয়নিয়ার স্কিম ২০২৬

✍ Dipak Karmoker 🕒 1 min read 📅 20 Apr 2026

বলা হয়ে থাকে, "সঞ্চয় মানুষের বিপদের বন্ধু।" কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির এই যুগে শুধু সঞ্চয় করলেই হয় না, সঞ্চয়টি সঠিক জায়গায় এবং সঠিক উপায়ে করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্চয়ের জন্য সবচেয়ে বিশ্বস্ত মাধ্যম হলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। আর এই ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় সঞ্চয় প্রকল্পের নাম হলো ‘মিলিয়নিয়ার স্কিম’।

অনেকেরই স্বপ্ন থাকে জীবনের একটি পর্যায়ে অন্তত ১০ লক্ষ টাকার মালিক হওয়া। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রতি মাসে অল্প অল্প করে টাকা জমা দেওয়ার যে পদ্ধতি, তাই মূলত মিলিয়নিয়ার স্কিম। তবে প্রশ্ন জাগে—বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ৫টি বড় ব্যাংকের মধ্যে কোনটির সুবিধা বেশি? কোথায় কিস্তি সবচেয়ে কম? আজকের এই ব্লগে আমরা সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী এবং কৃষি ব্যাংকের মিলিয়নিয়ার স্কিম নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করবো।

মিলিয়নিয়ার স্কিম আসলে কী?

সহজ কথায়, মিলিয়নিয়ার স্কিম হলো একটি বিশেষ মেয়াদী সঞ্চয় প্রকল্প (DPS)। যেখানে গ্রাহক নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা রাখেন। মেয়াদের শেষে মুনাফা এবং আসল মিলিয়ে গ্রাহকের হাতে ১০ লক্ষ টাকা তুলে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এই টাকা রাখা অত্যন্ত নিরাপদ বলে মনে করা হয়, কারণ এখানে সরকারি গ্যারান্টি থাকে।

১. জনতা ব্যাংক: নমনীয়তা ও সর্বনিম্ন কিস্তির রাজা

আমাদের বিশ্লেষণের শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের স্কিমটি সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময়। যারা প্রতি মাসে একদম কম টাকা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয় করতে চান, তাদের জন্য এটিই সেরা অপশন।

কিস্তির হার ও মেয়াদ:

বিশ্লেষণ: আপনি যদি ১৫ বছরের লম্বা সময়ের জন্য বিনিয়োগ করতে পারেন, তবে মাত্র ৩,১৪০ টাকা জমা দিয়েই আপনি মেয়াদের শেষে ১০ লক্ষ টাকা পেতে পারেন। কিস্তির পরিমাণ সর্বনিম্ন হওয়ার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য জনতা ব্যাংক প্রথম পছন্দ হতে পারে।

২. সোনালী ব্যাংক: নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক

দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাদের মিলিয়নিয়ার স্কিমে মেয়াদের অপশন অনেক বেশি— ৪, ৫, ৮, ৯, ১০, ১২ ও ১৫ বছর।

কিস্তির হার:

বিশ্লেষণ: জনতা ব্যাংকের তুলনায় সোনালী ব্যাংকের কিস্তির হার সামান্য বেশি। তবে এর প্রধান সুবিধা হলো মেয়াদের ভিন্নতা। আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো সময়ের (যেমন ৯ বা ১২ বছর) জন্য সঞ্চয় করতে চান, তবে সোনালী ব্যাংক আপনাকে সেই সুযোগ দেবে।

৩. রূপালী ব্যাংক: ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান

রূপালী ব্যাংকের মিলিয়নিয়ার স্কিম মূলত মাঝারি আয়ের মানুষদের কথা মাথায় রেখে সাজানো। তাদের কিস্তির হার জনতা ব্যাংকের চেয়ে বেশি হলেও অগ্রণী বা কৃষি ব্যাংকের চেয়ে কিছুটা কম।

কিস্তির হার:

বিশ্লেষণ: রূপালী ব্যাংকে ১০ বছরের কিস্তি ৫,৯০০ টাকা, যা সোনালী ব্যাংকের চেয়ে সামান্য কম। যারা দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয়ে ভারসাম্য খুঁজছেন, তারা এই ব্যাংকটি বিবেচনা করতে পারেন।

৪. অগ্রণী ব্যাংক: সীমিত কিন্তু সুনির্দিষ্ট

অগ্রণী ব্যাংকের স্কিমগুলোতে মেয়াদের অপশন কিছুটা কম এবং কিস্তির হার অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় কিছুটা চড়া।

কিস্তির হার:

বিশ্লেষণ: এখানে দীর্ঘমেয়াদী বা ১৫ বছরের কোনো অপশন সাধারণ মিলিয়নিয়ার স্কিমে দেখা যায় না। তবে যারা ৭ বছরের মতো মাঝারি মেয়াদে দ্রুত টাকা জমাতে চান, তাদের জন্য এটি ভালো হতে পারে।

৫. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (BKB): বিশেষায়িত সেবা

কৃষি ব্যাংক মূলত কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের জন্য কাজ করলেও তাদের সঞ্চয় প্রকল্পগুলো বেশ কার্যকর। তবে মিলিয়নিয়ার স্কিমের ক্ষেত্রে কিস্তির হার এখানেও কিছুটা বেশি।

কিস্তির হার:

৫টি ব্যাংকের তুলনামূলক টেবিল (একনজরে)

ব্যাংকের নাম ৫ বছরের কিস্তি (৳) ১০ বছরের কিস্তি (৳) ১৫ বছরের কিস্তি (৳)
জনতা ব্যাংক ১৩,৯০০ (সেরা) ৫,৭৫০ (সেরা) ৩,১৪০ (সেরা)
সোনালী ব্যাংক ১৪,৩২৫ ৫,৯৫০ ৩,২০০
রূপালী ব্যাংক ১৪,১০০ ৫,৯০০ ৩,২৫০
অগ্রণী ব্যাংক ১৪,৯০০ ৬,২৫০ নেই
কৃষি ব্যাংক ১৪,০০০ ৬,২৫০ নেই

মিলিয়নিয়ার স্কিম খোলার আগে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

ব্লগের এই অংশটি আপনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেবল কিস্তি দেখে টাকা জমা শুরু করবেন না, নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:

১. সরকারি কর ও ট্যাক্স (TDS)

মেয়াদ শেষে আপনি যখন ১০ লক্ষ টাকা পাবেন, পুরো টাকা আপনার পকেটে আসবে না। লভ্যাংশের ওপর সরকারি ট্যাক্স দিতে হয়। আপনার যদি TIN সার্টিফিকেট থাকে তবে ১০% ট্যাক্স কাটা হবে, আর TIN না থাকলে ১৫% ট্যাক্স কাটা হবে। এছাড়া আবগারি শুল্ক (Excise Duty) কর্তন করা হয়।

২. মুনাফার হার পরিবর্তনশীল

ব্যাংকগুলো সময়ে সময়ে তাদের মুনাফার হার পরিবর্তন করে। তাই একাউন্ট খোলার সময় যে কিস্তি নির্ধারণ করা হবে, সেটিই সাধারণত মেয়াদের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকে। তবে সার্কুলার অনুযায়ী তা পরিবর্তনও হতে পারে।

৩. নমিনি সংক্রান্ত তথ্য

সঞ্চয় প্রকল্পের ক্ষেত্রে নমিনি নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি একাউন্ট খোলার সময় জমা দিতে হয়। নিশ্চিত করুন যে আপনি বিশ্বস্ত কাউকে নমিনি করছেন।

৪. কিস্তি খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি

যদি কোনো মাসে কিস্তি দিতে দেরি হয়, তবে ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট হারে জরিমানা বা পেনাল্টি চার্জ করে। তাই এমন মেয়াদে স্কিম খুলুন যাতে আপনার কিস্তি দিতে সমস্যা না হয়।

৫. প্রাক-পরিপক্কতা বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে টাকা উত্তোলন

যদি মেয়াদের মাঝপথে আপনার টাকার প্রয়োজন হয়, তবে আপনি টাকা তুলতে পারবেন। তবে সেক্ষেত্রে মিলিয়নিয়ার স্কিমের পূর্ণ সুবিধা পাবেন না; বরং সাধারণ সঞ্চয় হিসাবের হারে মুনাফা পাবেন।

কেন আপনি মিলিয়নিয়ার স্কিম বেছে নেবেন?

বর্তমান সময়ে অনেক হাই-রিস্ক ইনভেস্টমেন্ট (যেমন শেয়ার বাজার বা বিটকয়েন) থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য মিলিয়নিয়ার স্কিম কেন সেরা?

  1. নিশ্চয়তা: সরকারি ব্যাংক হওয়ায় টাকা হারানোর কোনো ভয় নেই।

  2. শৃঙ্খল সঞ্চয়: প্রতি মাসে কিস্তি দেওয়ার মাধ্যমে একটি সেভিং হ্যাবিট বা সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠে।

  3. আর্থিক লক্ষ্য: সন্তানের উচ্চশিক্ষা, বিয়ে কিংবা অবসরের পর বড় কোনো পুঁজি তৈরির জন্য এটি একটি চমৎকার পরিকল্পনা।

  4. ঋণ সুবিধা: অধিকাংশ ব্যাংক মিলিয়নিয়ার স্কিমের জমানো টাকার বিপরীতে ৮০% থেকে ৯০% পর্যন্ত ঋণ (Loan against Deposit) প্রদান করে।

সিদ্ধান্ত: কোনটি আপনার জন্য সেরা?

আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী:

স্মার্ট টিপস: সঞ্চয় শুরু করার আগে আপনার নিকটস্থ ব্যাংক শাখায় গিয়ে বর্তমান সুদের হার এবং কিস্তির পরিমাণটি পুনরায় যাচাই করে নিন। কারণ ব্যাংকিং নীতিমালার পরিবর্তনের ফলে কিস্তির হার সামান্য কম-বেশি হতে পারে।

১০ লক্ষ টাকা আজ অনেক বড় মনে হলেও সময়ের সাথে সাথে মুদ্রাস্ফীতির কারণে এর মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে। তবুও একটি নিশ্চিত সঞ্চয় আপনার জীবনকে নিরাপদ করতে পারে। দেরি না করে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট কিস্তিতে আজই একটি মিলিয়নিয়ার স্কিম শুরু করুন। মনে রাখবেন, আজকের ছোট সঞ্চয়ই আগামীর বড় প্রাপ্তি।