রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয়টি বড় ব্যাংক – সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল – তাদের শীর্ষ ১২০ জন ঋণখেলাপির কাছ থেকে প্রত্যাশিত হারে ঋণ আদায় করতে পারছে না। শুধু তা-ই নয়, বিপুল খেলাপি ঋণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এই ছয় ব্যাংকের মধ্যে চারটিই এখন মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পর্যালোচনার আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেব।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সম্প্রতি রাষ্ট্রমালিকানাধীন এই ছয় ব্যাংকের সার্বিক অবস্থা যাচাই করে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিছু ব্যাংক আমানত সংগ্রহে ভালো করলেও ঋণ বিতরণে পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে, বেশ কয়েকটি ব্যাংক ছোট ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) এবং কৃষি খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ঋণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করছে না।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করে এই সমস্যা চিহ্নিত করেন। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকেই উঠে আসে ভয়াবহ চিত্র।
ছয় ব্যাংকের শীর্ষ ২০ জন করে ঋণখেলাপি, অর্থাৎ মোট ১২০ জনের কাছে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। গত বছর (২০২৫) এসব খেলাপির কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬৯ কোটি টাকা – যা মোট বকেয়ার মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ (আধা শতাংশ)।
রূপালী ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে। শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে পাওনা ৮ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় করেছে ৩৬১ কোটি টাকা।
জনতা ব্যাংক – পাওনা ৫৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, আদায় মাত্র ৫৬ কোটি টাকা।
সোনালী ব্যাংক – পাওনা ৬ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা, আদায় মাত্র ৯ কোটি টাকা।
ছয় ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ও বিডিবিএল ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংকই মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে জনতা ব্যাংক। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে বেসিক ব্যাংক, যেটি ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন,
“সরকারি সহায়তা দিয়ে এগুলোর মূলধন টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে দরকার ব্যাংক খাতের সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তন।”
বৈঠকে সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান বলেন, আমানত বাড়লেও সমান হারে ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে এসএমই ও কৃষি খাতে ঋণ বাড়াতে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মামলার জটিলতার কারণে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে আদায় বাড়ানো যাচ্ছে না।
গত বছর শেষে এই ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে:
| ব্যাংকের নাম | খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা) | খেলাপির হার |
|---|---|---|
| জনতা ব্যাংক | ৭২,৫৩৯ | ৭০% |
| বেসিক ব্যাংক | ৮,২৫৫ | ৬৫% |
| অগ্রণী ব্যাংক | ২৬,৭৭২ | ৩৬% |
| রূপালী ব্যাংক | ১৯,৬৭০ | ৩৮% |
| সোনালী ব্যাংক | ১৭,৯০০ | ১৫.৩৫% |
| বিডিবিএল | ৯৯৮ | ৩৯% |
এছাড়া ছয় ব্যাংকের অবলোপন করা ঋণ (বাংলা: লিখে ফেলা ঋণ) দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে একা সোনালী ব্যাংকের অবলোপন ঋণ ৯ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই অবস্থার জন্য দায়ী দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আইনি জটিলতা ও কাঠামোগত সমস্যা। যদি দ্রুত সংস্কার না আনা হয়, তবে ব্যাংকগুলো দাঁড়াতে পারবে না সরকারি সহায়তার বাইরে। সাধারণ গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তাও বটে।
আপনার মতামত দিন: আপনি কি মনে করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর কার্যকরী উপায় কী? কমেন্টে জানান।
তথ্যসুত্রঃ prothomalo