ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম ২০২৬ ও প্রয়োজনীয় সব তথ্য
ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম জানা থাকলে আপনি খুব সহজেই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। ডাচ বাংলা ব্যাংক পিএলসি (DBBL) বর্তমানে আধুনিক ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এক অনন্য নাম। আপনি যদি সঞ্চয় করতে চান কিংবা ব্যবসায়িক লেনদেন করতে চান, তবে একটি সঠিক ব্যাংক একাউন্ট আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই ব্লগে আমরা আলোচনা করবো ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খুলতে কি কি লাগে, কত টাকা লাগে এবং একাউন্ট খোলার ধাপগুলো কী কী।
ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম মূলত নির্ভর করে আপনি কোন ধরণের একাউন্ট করতে চাচ্ছেন তার ওপর। সাধারণ সেভিংস একাউন্ট থেকে শুরু করে স্টুডেন্ট একাউন্ট পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আমাদের দেশে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ এবং ফাস্ট ট্র্যাকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই ব্যাংকে একাউন্ট খুলতে বেশি আগ্রহী হয়।

ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট এর ধরণ (Types of Account)
ডাচ বাংলা ব্যাংক তার গ্রাহকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে বিভিন্ন ক্যাটাগরির একাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী আপনি নিচের যেকোনো একটি হিসাব বেছে নিতে পারেন:
- সেভিংস ডিপোজিট একাউন্ট স্টান্ডার্ড: এটি সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় সঞ্চয়ী হিসাব।
- ডিবিবিএল স্কুল সেভার্স একাউন্ট: স্কুল বা কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা সম্পন্ন একাউন্ট।
- এক্সেল সেভিংস একাউন্ট: যারা একটু বেশি ইন্টারেস্ট রেট চান তাদের জন্য উপযোগী।
- কারেন্ট ডিপোজিট একাউন্ট: মূলত ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের বড় লেনদেনের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
- ডাচ বাংলা ব্যাংক ডিপোজিট প্লাস: মাসিক কিস্তি ভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্প।
- ইন্টারেস্ট ফ্রি সেভিংস ডিপোজিট একাউন্ট: যারা সুদমুক্ত ব্যাংকিং করতে চান।
- স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট একাউন্ট: স্বল্প সময়ের নোটিশে বড় অংকের টাকা লেনদেনের জন্য।
আরও জেনে নিনঃ ডাচ বাংলা ব্যাংক ডিপিএস চার্ট
ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খুলতে কি কি লাগে
সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সাথে না থাকলে ব্যাংকে গিয়ে বারবার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম অনুযায়ী আপনার নিচের কাগজপত্রগুলো সংগ্রহে রাখতে হবে:
- জাতীয় পরিচয়পত্র: আবেদনকারীর এনআইডি (NID) কার্ডের ফটোকপি।
- ছবি: আবেদনকারীর ২ কপি ল্যাব প্রিন্ট পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- নমিনির তথ্য: নমিনির ১ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং এনআইডি কার্ডের ফটোকপি।
- ইউটিলিটি বিল: ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির বিলের ফটোকপি।
- পেশার প্রমাণ: চাকুরিজীবীদের জন্য আইডি কার্ড/পে-স্লিপ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স।
- শিক্ষার্থী প্রমাণ: স্টুডেন্ট একাউন্টের ক্ষেত্রে বৈধ স্টুডেন্ট আইডি কার্ড বা প্রত্যয়নপত্র।
- ই-টিন (e-TIN): কর রেয়াত পেতে চাইলে টিন সার্টিফিকেট জমা দেওয়া ভালো।
- মোবাইল নম্বর: একটি সচল বাংলাদেশি মোবাইল নাম্বার।
অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা (Table)
| নথিপত্রের নাম | আবেদনকারীর কপি | নমিনির কপি |
| পাসপোর্ট সাইজ ছবি | ২ কপি | ১ কপি |
| এনআইডি/পাসপোর্ট/জন্ম নিবন্ধন | ১ কপি | ১ কপি |
| ইউটিলিটি বিলের কপি | ১ কপি | প্রয়োজন নেই |
| স্টুডেন্ট আইডি (ছাত্রদের জন্য) | ১ কপি | প্রয়োজন নেই |
| ট্রেড লাইসেন্স (ব্যবসায়ীদের জন্য) | ১ কপি | প্রয়োজন নেই |
ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খুলতে কত টাকা লাগে
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে ডাচ বাংলা ব্যাংকে একাউন্ট খুলতে কত টাকা জমা দিতে হয়। মনে রাখবেন, এই টাকাটি আপনার ব্যাংক একাউন্টেই থাকবে যা ‘ইনিশিয়াল ডিপোজিট’ বা ‘ব্লক মানি’ হিসেবে পরিচিত। একাউন্টের ধরণ ভেদে টাকার পরিমাণ নিচে দেওয়া হলো:
- সেভিংস ডিপোজিট স্টান্ডার্ড: ৫০০ টাকা।
- স্কুল সেভার্স একাউন্ট: মাত্র ১০০ টাকা।
- কারেন্ট একাউন্ট: ১,০০০ টাকা।
- এক্সেল সেভিংস একাউন্ট: ৫০০ টাকা।
- ডিপোজিট প্লাস/সুদমুক্ত সেভিংস: ৫,০০০ টাকা।
- স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট: ২,০০০ টাকা।
এই টাকাগুলো জমা দিয়ে একাউন্ট সচল করার পর আপনি চাইলে পরবর্তীতে চেক বই বা এটিএম কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন। সরকারি ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জ একাউন্টের ধরণ অনুযায়ী বাৎসরিকভাবে কেটে নেওয়া হয়।
ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম: ধাপে ধাপে নির্দেশিকা
আপনি যদি অনলাইনে অ্যাপের মাধ্যমে একাউন্ট খুলতে না পারেন, তবে সরাসরি শাখায় গিয়ে একাউন্ট খোলা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। নিচে বিস্তারিত ধাপগুলো দেওয়া হলো:
১. নিকটস্থ ব্রাঞ্চ বা উপশাখা নির্বাচন
প্রথমে আপনার বাড়ির বা অফিসের কাছের কোনো ডাচ বাংলা ব্যাংক ব্রাঞ্চ অথবা সাব-ব্রাঞ্চ খুঁজে বের করুন। ব্যাংকিং সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টাকা নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন।
২. আবেদন ফরম সংগ্রহ ও পূরণ
ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিস ডেস্কে গিয়ে একাউন্ট খোলার ফরম সংগ্রহ করুন। ফরমে আপনার নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং নমিনির তথ্য নির্ভুলভাবে লিখুন। খেয়াল রাখবেন যাতে আপনার এনআইডি কার্ডের তথ্যের সাথে ফরমের তথ্যের মিল থাকে।
৩. ডকুমেন্ট সংযুক্তকরণ
আপনার ছবি ও এনআইডি কার্ডের ফটোকপির পেছনে আপনার স্বাক্ষর দিন। নমিনির ছবির পেছনেও আপনার স্বাক্ষর লাগবে। সমস্ত নথিপত্র একসাথে পিন দিয়ে ফরমের সাথে সংযুক্ত করুন।
৪. টাকা জমা বা ডিপোজিট
আবেদন ফরম জমা দেওয়ার পর দায়িত্বরত কর্মকর্তা আপনাকে একটি ডিপোজিট স্লিপ দেবেন। ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে নির্ধারিত টাকা (৫০০ বা ৫০০০ যা প্রযোজ্য) জমা দিন এবং জমার রশিদের গ্রাহক অংশটি নিজের কাছে রাখুন।
৫. একাউন্ট সচল ও চেক বই সংগ্রহ
সব প্রক্রিয়া শেষ হলে ব্যাংক আপনার তথ্য যাচাই করবে। সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আপনার মোবাইলে একাউন্ট নম্বর সম্বলিত একটি মেসেজ আসবে। একাউন্ট খোলার ৭ থেকে ১০ দিন পর আপনি ব্যাংক থেকে আপনার চেক বই এবং ডেবিট কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
ডাচ বাংলা ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং একাউন্ট খোলার নিয়ম
যাদের আশেপাশে কোনো মেইন ব্রাঞ্চ নেই, তারা ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকা ডাচ বাংলা ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে একাউন্ট খুলতে পারেন। এখানে আঙুলের ছাপ (Biometric) ব্যবহার করে দ্রুত একাউন্ট খোলা যায়। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে খরচ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রায় একই রকম।
ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্টের সুবিধা সমূহ
- বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এটিএম বুথ ব্যবহারের সুবিধা।
- খুবই উন্নত মানের ডাচ বাংলা ব্যাংক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা।
- NexusPay অ্যাপের মাধ্যমে কেনাকাটা ও বিল পরিশোধের সুযোগ।
- রকেট (Rocket) মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাথে একাউন্ট লিঙ্ক করার সুবিধা।
- সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ফাস্ট ট্র্যাক পয়েন্ট।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ডাচ বাংলা ব্যাংক স্টুডেন্ট একাউন্ট খোলার বয়স কত?
সাধারণত ১৮ বছরের নিচে স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল সেভার্স একাউন্ট এবং ১৮ বছরের উপরে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত সেভিংস বা এক্সেল একাউন্ট খোলা যায়।
জন্ম নিবন্ধন দিয়ে কি ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খোলা যায়?
হ্যাঁ, যদি আপনার এনআইডি কার্ড না থাকে তবে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন কার্ড এবং সাথে একজন এনআইডি ধারী শনাক্তকারীর তথ্যের মাধ্যমে একাউন্ট খোলা সম্ভব।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং চার্জ কত?
নিজ আউটলেটে টাকা জমা এবং উত্তোলন সম্পূর্ণ ফ্রি। তবে অন্য এরিয়ার আউটলেট থেকে লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে সামান্য কিছু চার্জ (২ থেকে ৪ টাকা) প্রযোজ্য হতে পারে।
ডাচ বাংলা ব্যাংকে সর্বোচ্চ কত টাকা রাখা যায়?
আপনি আপনার বৈধ আয়ের প্রমাণের ভিত্তিতে যেকোনো পরিমাণ টাকা রাখতে পারেন। বড় অংকের লেনদেনের ক্ষেত্রে সোর্স অফ ফান্ড বা আয়ের উৎস দেখাতে হয়।
একাউন্ট খোলার কতদিন পর এটিএম কার্ড পাওয়া যায়?
সাধারণত আবেদন করার ৭ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আপনার কাঙ্ক্ষিত ব্রাঞ্চ থেকে কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
শেষ কথা
ডাচ বাংলা ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম অত্যন্ত সহজ এবং গ্রাহকবান্ধব। আপনি আপনার সঞ্চয়কে নিরাপদ রাখতে এবং আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধার সাথে যুক্ত থাকতে আজই আপনার নিকটস্থ ডাচ বাংলা ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন। সঠিক কাগজপত্র এবং প্রয়োজনীয় ডিপোজিট নিয়ে গেলে এক দিনেই আপনি আপনার ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন। এই নিবন্ধটি যদি আপনার উপকারে আসে তবে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।



