সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম ও বিস্তারিত ২০২৬
বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং সেবা মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে সিটি ব্যাংক লিমিটেড তাদের গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা অনেক সহজতর করেছে। আপনি যদি একটি নিরাপদ এবং আধুনিক ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা পেতে চান, তবে সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম আপনার জানা থাকা জরুরি।
City Bank Account Opening System এখন অনেক বেশি সহজ এবং দ্রুত। আপনি চাইলে ঘরে বসে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটে আপনার একাউন্ট খুলে নিতে পারেন। আবার সরাসরি ব্যাংকের শাখায় গিয়েও প্রথাগত পদ্ধতিতে একাউন্ট খোলার সুযোগ রয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সিটি ব্যাংকের বিভিন্ন ধরণের একাউন্ট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইনে একাউন্ট খোলার ধাপগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
আরও জেনে নিনঃ সিটি ব্যাংক লোন পাওয়ার সহজ উপায়
সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আপনি অনলাইন বা অফলাইন যেভাবেই একাউন্ট খুলতে চান না কেন, কিছু মৌলিক নথিপত্র আপনার কাছে থাকতে হবে। সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন হয়:
- আবেদনকারীর ছবি: পাসপোর্ট সাইজের ২ কপি ল্যাব প্রিন্ট ছবি।
- পরিচয়পত্র: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট অথবা জন্ম নিবন্ধনের কপি।
- নমিনীর তথ্য: নমিনীর এক কপি ছবি এবং তার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
- ঠিকানার প্রমাণ: বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল বা গ্যাস বিলের কপি (প্রয়োজন হতে পারে)।
- আয়ের উৎস: চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্লিপ বা ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্সের কপি।
- ই-টিআইএন (e-TIN): যদি করদাতা হয়ে থাকেন, তবে টিআইএন সার্টিফিকেটের কপি।
সরাসরি ব্যাংকে গিয়ে সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম
আপনি যদি সরাসরি ব্যাংকের শাখায় গিয়ে একাউন্ট খুলতে পছন্দ করেন, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- ১. আপনার নিকটস্থ সিটি ব্যাংকের যেকোনো শাখায় প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্রসহ উপস্থিত হোন।
- ২. দায়িত্বরত ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে একাউন্ট খোলার ফর্ম সংগ্রহ করুন।
- ৩. ফর্মে আপনার নাম, ঠিকানা, পেশা এবং নমিনীর তথ্য নির্ভুলভাবে পূরণ করুন।
- ৪. আপনার ছবির পেছনে স্বাক্ষর করুন এবং নির্দিষ্ট স্থানে আঙুলের ছাপ বা স্বাক্ষর দিন।
- ৫. ফর্ম পূরণ শেষ হলে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস এবং প্রাথমিক জমার টাকা (Initial Deposit) সহ জমা দিন।
- ৬. ব্যাংক কর্মকর্তা আপনার তথ্য যাচাই করে একাউন্টটি সক্রিয় করে দেবেন।
অনলাইনে সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম (Citytouch)
সময়ের সাশ্রয় করতে সিটি ব্যাংক নিয়ে এসেছে ‘City touch অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে আপনি যেকোনো সময় নিজের স্মার্টফোন ব্যবহার করে একাউন্ট খুলতে পারবেন। অনলাইন প্রক্রিয়ার ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. অ্যাপ ডাউনলোড ও ভাষা নির্বাচন
প্রথমে গুগল প্লে-স্টোর বা অ্যাপল স্টোর থেকে ‘Citytouch’ অ্যাপটি ডাউনলোড করুন। অ্যাপটি ওপেন করে আপনার পছন্দের ভাষা (বাংলা বা ইংরেজি) নির্বাচন করুন।
২. মোবাইল নম্বর ভেরিফিকেশন
আপনার সক্রিয় মোবাইল নম্বরটি দিন। আপনার নম্বরে একটি ওটিপি (OTP) কোড আসবে, সেটি বসিয়ে ভেরিফাই করুন।
৩. এনআইডি কার্ডের ছবি আপলোড
আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের সামনের এবং পেছনের অংশের স্পষ্ট ছবি তুলুন। অ্যাপটি অটোমেটিক আপনার তথ্যগুলো রিড করে নেবে।
৪. নিজের সেলফি এবং পেশা নির্বাচন
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের একটি পরিষ্কার সেলফি তুলুন। এরপর আপনার পেশা এবং মাসিক আয়ের তথ্য প্রদান করুন।
৫. নমিনীর বিস্তারিত তথ্য
যাকে নমিনি করতে চান তার নাম, এনআইডি নম্বর এবং ছবি আপলোড করুন। নমিনীর সাথে আপনার সম্পর্ক কী তা নির্বাচন করুন।
৬. শাখা এবং একাউন্টের ধরণ নির্বাচন
আপনার এলাকা বা নিকটস্থ সিটি ব্যাংকের শাখা নির্বাচন করুন। এরপর আপনি কোন ধরণের একাউন্ট (সেভিংস বা কারেন্ট) খুলতে চান তা নিশ্চিত করুন। সকল শর্তাবলী মেনে সাবমিট করলেই আপনার একাউন্ট খোলার আবেদন সম্পন্ন হবে।
সিটি ব্যাংক একাউন্ট চেক করার নিয়ম
একাউন্ট খোলার পর ব্যালেন্স চেক করা বা লেনদেনের বিবরণ দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিটি ব্যাংক একাউন্ট চেক করার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে:
- সিটি টাচ (City Touch): এটি সিটি ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ। এখানে লগইন করে আপনি যেকোনো সময় ব্যালেন্স চেক, ফান্ড ট্রান্সফার এবং বিল পেমেন্ট করতে পারেন।
- ইন্টারনেট ব্যাংকিং: সিটি ব্যাংকের ওয়েবসাইট (citibank.com.bd) থেকে আপনার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে ব্যালেন্স দেখতে পারবেন।
- এটিএম বুথ: যেকোনো সিটি ব্যাংক বা অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে ব্যালেন্স চেক করা সম্ভব।
- এসএমএস ব্যাংকিং: নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর থেকে নির্দিষ্ট কোড পাঠিয়েও ব্যালেন্স জানা যায়।
সিটি ব্যাংকে একাউন্ট খুলতে কত টাকা লাগে
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে যে সিটি ব্যাংকে একাউন্ট খুলতে কত টাকা লাগে? মূলত সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্য আলাদা কোনো ফি বা চার্জ নেয় না। তবে একাউন্টটি সচল করতে আপনাকে একটি প্রাথমিক আমানত বা Initial Deposit জমা দিতে হয়।
সাধারণত ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী একাউন্ট বা সেভিংস একাউন্টের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা জমা দিয়ে একাউন্ট শুরু করা যায়। এই টাকাটি আপনার একাউন্টেই জমা থাকবে, যা আপনি পরবর্তীতে ব্যবহার করতে পারবেন। তবে একাউন্টের ধরণ বা বিশেষ স্কিম অনুযায়ী এই টাকার পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে।
সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার সুবিধা
সিটি ব্যাংকে একাউন্ট থাকলে আপনি বেশ কিছু চমৎকার সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন:
- আধুনিক অ্যাপ সুবিধা: সিটি টাচ অ্যাপের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা ব্যাংকিং সেবা।
- ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড: আন্তর্জাতিক মানের ভিসা বা আমেরিকান এক্সপ্রেস (Amex) কার্ড ব্যবহারের সুযোগ।
- ক্যাশব্যাক সুবিধা: বিভিন্ন শপিং মল বা রেস্টুরেন্টে কার্ড পেমেন্টে আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক ও ডিসকাউন্ট।
- লোন সুবিধা: একাউন্ট হোল্ডাররা সহজেই পার্সোনাল লোন, অটো লোন বা হোম লোনের জন্য আবেদন করতে পারেন।
- চেকবুক ও এটিএম: দ্রুত টাকা উত্তোলনের জন্য চেকবুক এবং সারা দেশে বিস্তৃত এটিএম নেটওয়ার্ক।
সিটি ব্যাংকের বিভিন্ন ধরণের লোন সুবিধা
সিটি ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন ধরণের ঋণ বা লোন প্রদান করে থাকে। যেমন: ১. পার্সোনাল লোন: ব্যক্তিগত যেকোনো প্রয়োজনে এই লোন নেওয়া যায়। ২. অটো লোন: নতুন বা পুরাতন গাড়ি কেনার জন্য এই সুবিধা। ৩. হোম লোন: বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। ৪. সিটি বাইক লোন: মোটরসাইকেল কেনার জন্য বিশেষ লোন সুবিধা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১৮ বছরের কম বয়সীরা কি একাউন্ট খুলতে পারবে?
হ্যাঁ, তবে সেক্ষেত্রে অভিভাবকের (পিতা বা মাতা) অধীনে ‘মাইনর একাউন্ট’ খুলতে হবে।
অনলাইন একাউন্ট খুললে কি চেকবুক পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, অনলাইনে একাউন্ট খোলার পর আপনি সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে চেকবুক এবং ডেবিট কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
সিটি ব্যাংক কি শুক্রবার খোলা থাকে?
সিটি ব্যাংকের সাধারণ শাখাগুলো বন্ধ থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ বা ‘প্রায়োরিটি সেন্টার’ সীমিত পরিসরে সেবা প্রদান করে। তবে ডিজিটাল ব্যাংকিং ২৪ ঘণ্টাই সচল।
একাউন্ট খোলার কতক্ষণ পর লেনদেন করা যাবে?
অনলাইনে একাউন্ট খোলার পর সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেটি পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে যায় এবং আপনি লেনদেন শুরু করতে পারেন।
শেষ কথা
সিটি ব্যাংক লিমিটেড বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি আধুনিক নাম। সিটি ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়মগুলো অত্যন্ত সহজ এবং গ্রাহকবান্ধব হওয়ার কারণে এটি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। আপনি যদি ঝামেলামুক্ত ব্যাংকিং এবং চমৎকার কাস্টমার সার্ভিস চান, তবে আজই আপনার নিকটস্থ শাখা বা সিটি এখনই অ্যাপের মাধ্যমে একাউন্ট খুলে নিতে পারেন। ডিজিটাল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে আপনার জীবনকে আরও সহজ এবং গতিশীল করুন।
আপনার যদি একাউন্ট খোলা নিয়ে আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে সরাসরি সিটি ব্যাংকের কল সেন্টারে ১৬২৩৪ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।



