ব্যাংক

অগ্রণী ব্যাংক কি সরকারি নাকি বেসরকারি?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো অগ্রণী ব্যাংক। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়— আসলে অগ্রণী ব্যাংক কি সরকারি? বিশেষ করে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা বা সঞ্চয় করার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি জানা অত্যন্ত জরুরি। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমরা এই নিবন্ধে অগ্রণী ব্যাংকের মালিকানা, এর সেবার মান এবং এটি সরকারি খাতের অংশ কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ব্যাংকিং সেক্টরে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নাম সবার আগে আসে। অগ্রণী ব্যাংক তার বিশাল শাখা নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংক কি সরকারি নাকি বেসরকারি?

সরাসরি বলতে গেলে, অগ্রণী ব্যাংক একটি শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। অর্থাৎ, এটি একটি সরকারি ব্যাংক। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে হাবিব ব্যাংক লিমিটেড এবং কমার্স ব্যাংক লিমিটেডকে একীভূত করে এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে বর্তমানে এটি একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যার শতভাগ শেয়ারের মালিক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে অগ্রণী ব্যাংকের গুরুত্ব

সরকারি ব্যাংক হওয়ার কারণে এখানে আমানতকারীদের ঝুঁকির পরিমাণ প্রায় শূন্য। সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ায় মন্দা বা অর্থনৈতিক সংকটেও এই ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। মূলত কৃষি ঋণ, শিল্প ঋণ এবং রেমিট্যান্স আহরণে এই ব্যাংকটি সরকারের বিশেষ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

অগ্রণী ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর্থিক খাত পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোকে জাতীয়করণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ অগ্রণী ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে ব্যাংকটির মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন করা এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।

প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আজ পর্যন্ত ব্যাংকটি তার নামের সার্থকতা বজায় রেখেছে। এটি প্রথম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে অনলাইন ব্যাংকিং এবং রিয়েল-টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (RTGS) এর মতো আধুনিক সুবিধাগুলো চালু করে। বর্তমানে এর ৯৫০টিরও বেশি শাখা এবং শত শত এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট রয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি (Agrani Bank PLC) হওয়ার কারণ

অনেকে ব্যাংকের নামের শেষে ‘PLC’ বা ‘পিএলসি’ দেখে বিভ্রান্ত হন এবং ভাবেন এটি হয়তো বেসরকারি হয়ে গেছে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। ২০০৭ সালে একটি কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে অগ্রণী ব্যাংককে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। এটি মূলত ব্যাংকের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার জন্য করা হয়েছিল। এই পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে, কিন্তু এর মালিকানায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। সরকারই এর একমাত্র স্টেকহোল্ডার।

অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান সেবাসমূহ

একটি সরকারি ব্যাংক হিসেবে অগ্রণী ব্যাংক তার গ্রাহকদের বৈচিত্র্যময় সেবা প্রদান করে থাকে। নিচে এর প্রধান কিছু সেবার তালিকা দেওয়া হলো:

১. সেভিংস ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট

সাধারণ মানুষের জন্য সেভিংস অ্যাকাউন্ট এবং ব্যবসায়ীদের জন্য কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা রয়েছে। এখানে সুদের হার সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, যা আমানতকারীদের জন্য লাভজনক।

২. রেমিট্যান্স সেবা (Remittance Service)

প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়ের টাকা নিরাপদে দেশে পাঠানোর জন্য অগ্রণী ব্যাংক বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ‘অগ্রণী রেমিট্যান্স অ্যাপ’ এর মাধ্যমে প্রবাসীরা এখন মুহূর্তেই দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন। সরকারি ব্যাংক হওয়ায় প্রবাসীরা এখানে ২.৫% থেকে ৫% পর্যন্ত সরকারি প্রণোদনা পেয়ে থাকেন।

৩. ঋণ সুবিধা (Loan Products)

  • কৃষি ঋণ: প্রান্তিক কৃষকদের জন্য নামমাত্র সুদে ঋণ প্রদান।
  • এসএমই লোন: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রসারে সহায়তা।
  • গৃহ নির্মাণ ঋণ: সরকারি চাকরিজীবী এবং সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ি তৈরির ঋণ।
  • পার্সোনাল লোন: ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা।

সরকারি ব্যাংক হিসেবে অগ্রণী ব্যাংকের সুযোগ-সুবিধা

অগ্রণী ব্যাংক কি সরকারি এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এর সুবিধাগুলো নিয়ে আলোচনা আসে। বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় এখানে কিছু বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়:

  • নিরাপত্তা: সরকারি গ্যারান্টি থাকায় গ্রাহকের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ।
  • কম চার্জ: চেকবই, এটিএম কার্ড এবং অ্যাকাউন্ট মেইনটেন্যান্স চার্জ বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম।
  • পেনশন সুবিধা: অনেক সরকারি দপ্তরের পেনশন এই ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়।
  • সরকারি স্কিম: সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী যেমন— বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ইত্যাদি এই ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান করা হয়।

অগ্রণী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং: প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করছে। যেসব এলাকায় ব্যাংকের মূল শাখা পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে এজেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ করছে। টাকা জমা দেওয়া, উত্তোলন করা এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য এখন আর শহরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না।

অগ্রণী ব্যাংক ও অনলাইন ব্যাংকিং (Digital Banking)

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে অগ্রণী ব্যাংক এখন আর সেই মান্ধাতা আমলের ব্যাংক নেই। বর্তমানে এদের ‘Agrani Smart Banking’ অ্যাপের মাধ্যমে ফান্ড ট্রান্সফার, মোবাইল রিচার্জ এবং ব্যালেন্স চেক করা যায় নিমেষেই। এছাড়া এদের এটিএম বুথগুলো সারা দেশে বিস্তৃত, যা ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদান করে।

অগ্রণী ব্যাংকে ক্যারিয়ার ও নিয়োগ প্রক্রিয়া

যেহেতু এটি একটি সরকারি ব্যাংক, তাই এখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ। মূলত ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির (BSC) মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে এখানে জনবল নিয়োগ করা হয়। সরকারি চাকরির সকল সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাছে অগ্রণী ব্যাংক একটি স্বপ্নের কর্মস্থল।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

অগ্রণী ব্যাংক কি পুরোপুরি সরকারি

হ্যাঁ, অগ্রণী ব্যাংক একটি শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর সকল শেয়ারের মালিক বাংলাদেশ সরকার।

অগ্রণী ব্যাংক কি বেসরকারি হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

বর্তমানে সরকারের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হলেও এর নিয়ন্ত্রণ এবং মালিকানা সরকারের হাতেই থাকবে।

অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় কোথায়?

অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত (৯ ডিআইটি অ্যাভিনিউ)।

শেষ কথা

সার্বিক পর্যালোচনায় এটি পরিষ্কার যে, অগ্রণী ব্যাংক কি সরকারি— এই নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এটি বাংলাদেশের একটি প্রথম সারির সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। যারা নিরাপত্তা এবং আস্থার সাথে ব্যাংকিং করতে চান, তাদের জন্য অগ্রণী ব্যাংক একটি চমৎকার পছন্দ। সরকারি খাতের ব্যাংক হিসেবে এটি যেমন দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, তেমনি সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নেও নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আশা করি এই নিবন্ধটি আপনার মনে থাকা সকল সংশয় দূর করতে সক্ষম হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button