ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আনা যাচ্ছে নগদ ওয়ালেটে
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম। প্রবাসীরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির টাকা দেশে পাঠানোর জন্য সবসময় একটি নিরাপদ এবং দ্রুত মাধ্যম খুঁজে থাকেন। প্রবাসীদের এই কষ্ট লাঘব করতে এবং তাদের পরিবারের কাছে দ্রুত অর্থ পৌঁছে দিতে সম্প্রতি একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’ এবং ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি। এখন থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো রেমিট্যান্স সরাসরি সুবিধাভোগীর নগদ ওয়ালেটে চলে আসবে। এই ন্যাশনাল ব্যাংক নগদ রেমিট্যান্স সেবাটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ন্যাশনাল ব্যাংক ও নগদের নতুন চুক্তি: একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ
রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও গতিশীল এবং সহজ করতে সম্প্রতি ঢাকার বনানীতে নগদের প্রধান কার্যালয়ে একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি এবং নগদের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ কোনো ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদিল চৌধুরী এবং নগদের প্রশাসক মো. মোতাছিম বিল্লাহ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন। উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা মনে করেন, এই উদ্যোগের ফলে প্রবাসী আয় বৈধ পথে দেশে আসার হার অনেক বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে。
কেন প্রবাসীদের জন্য এই সেবাটি গুরুত্বপূর্ণ?
বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের বড় একটি অংশ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় অথবা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ন্যাশনাল ব্যাংক নগদ রেমিট্যান্স সেবার মাধ্যমে এখন আর সেই ভোগান্তি পোহাতে হবে না।
১. ২৪ ঘণ্টা টাকা তোলার সুবিধা
প্রথাগত ব্যাংকিং সময়ের বাইরেও অর্থাৎ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সপ্তাহের যেকোনো দিন গ্রাহক তার নগদ ওয়ালেটে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন। এটি জরুরি প্রয়োজনে গ্রাহকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
২. সর্বনিম্ন ক্যাশ আউট চার্জ
নগদ তার সাশ্রয়ী সেবার জন্য পরিচিত। রেমিট্যান্স গ্রাহকরা তাদের প্রাপ্ত অর্থ সর্বনিম্ন ক্যাশ আউট খরচে তুলতে পারবেন, যা তাদের আর্থিক সাশ্রয় নিশ্চিত করবে।
৩. হাতের কাছেই উদ্যোক্তা পয়েন্ট
সারাদেশে নগদের প্রায় তিন লাখেরও বেশি উদ্যোক্তা পয়েন্ট রয়েছে। এর ফলে গ্রাম বা মফস্বলের গ্রাহকদের টাকা তোলার জন্য আর দূরে কোনো ব্যাংকের শাখায় যেতে হবে না। বাড়ির পাশের দোকান থেকেই তারা অনায়াসেই টাকা সংগ্রহ করতে পারবেন।
রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া: কিভাবে পাবেন এই সেবা?
ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে নগদ ওয়ালেটে রেমিট্যান্স পাঠানো অত্যন্ত সহজ। একজন প্রবাসী নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে তার স্বজনদের কাছে অর্থ পাঠাতে পারেন:
- এক্সচেঞ্জ হাউস: প্রবাসীরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ হাউসে গিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে নগদ ওয়ালেটে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করতে পারেন।
- মানি ট্রান্সফার অপারেটর (MTO): বর্তমানে ৬০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অপারেটর এই সেবার সাথে যুক্ত আছে। ফলে আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়া—যেকোনো প্রান্ত থেকেই টাকা পাঠানো সম্ভব।
- সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেল: ন্যাশনাল ব্যাংকের নির্ধারিত পার্টনারদের মাধ্যমেও এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।
২.৫ শতাংশ সরকারি প্রণোদনা
বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ সরকার ২.৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। ন্যাশনাল ব্যাংক নগদ রেমিট্যান্স সেবা গ্রহণকারীরাও এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না। অর্থাৎ, যদি কোনো প্রবাসী ১০০ টাকা পাঠান, তবে তার স্বজন নগদ ওয়ালেটে ১০২ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। এই বাড়তি অর্থ প্রবাসীদের পরিবারকে বাড়তি সচ্ছলতা দান করে।
আজকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
রেমিট্যান্স পাঠানোর আগে বর্তমান মুদ্রার হার জানা থাকা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের বিনিময় হার নিচে দেওয়া হলো:
| মুদ্রা | ক্রয় (টাকা) | বিক্রয় (টাকা) |
| ডলার | ১২২.৩০ | ১২২.৩০ |
| ইউরো | ১৪৪.৩৮ | ১৪৪.৪১ |
| পাউন্ড | ১৬৬.৯৩ | ১৬৭.০৪ |
| অস্ট্রেলীয় ডলার | ৮৫.৫৭ | ৮৫.৫৯ |
| ইয়েন | ০.৭৮ | ০.৭৮ |
| সিঙ্গাপুরি ডলার | ৯৬.০৭ | ৯৬.১৪ |
| ইউয়ান | ১৭.৬২ | ১৭.৬২ |
| রুপি | ১.৩৫ | ১.৩৫ |
বি: দ্র: মুদ্রার হার সময় ভেদে পরিবর্তন হতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতিতে এই সেবার প্রভাব
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। ন্যাশনাল ব্যাংক ও নগদের এই চুক্তির মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া হুন্ডির মতো অবৈধ পথ পরিহার করে সাধারণ মানুষ বৈধ চ্যানেল ব্যবহারে উৎসাহিত হবে। যখন টাকা পাওয়া সহজ হয়, তখন মানুষ ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি বেশি আস্থাশীল হয়ে ওঠে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে নগদে রেমিট্যান্স পাঠাতে বাড়তি খরচ আছে কি?
না, প্রবাসীরা প্রচলিত ফি দিয়ে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন। বরং বৈধ পথে পাঠানোর জন্য সরকার বাড়তি ২.৫% প্রণোদনা দেবে।
২. টাকা পৌঁছাতে কত সময় লাগে?
সাধারণত এই প্রক্রিয়াটি রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয়। তবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সার্ভার বা প্রক্রিয়াকরণের কারণে সামান্য সময় লাগতে পারে।
৩. নগদ ওয়ালেটে টাকা আসার পর কি এটি সবখানে ব্যবহার করা যাবে?
হ্যাঁ, নগদ ওয়ালেটে আসা রেমিট্যান্সের টাকা দিয়ে আপনি মোবাইল রিচার্জ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং ক্যাশ আউট—সবই করতে পারবেন।
৪. লোন বা অন্যান্য সুবিধা কি এই সেবার আওতায় পাওয়া যাবে?
বর্তমানে এটি মূলত রেমিট্যান্স বিতরণ সেবা। তবে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে ভবিষ্যতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের লোন বা অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে ন্যাশনাল ব্যাংক নগদ রেমিট্যান্স সেবা একটি বড় মাইলফলক। এটি শুধু একটি ব্যাংকিং চুক্তি নয়, বরং লাখ লাখ প্রবাসী পরিবারের কষ্ট লাঘবের একটি ডিজিটাল সমাধান। এখন থেকে প্রবাসীদের প্রিয়জনেরা কোনো অপেক্ষা ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে রেমিট্যান্সের অর্থ হাতে পাবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।



