ব্যাংক

সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা উঠে যাচ্ছে? সরকারের বিশাল সুখবর

বাংলাদেশে নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী সবারই ভরসার জায়গা এটি। কিন্তু গত কয়েক বছরে নানা কড়াকড়ি ও সীমার কারণে অনেকেই মন খুলে বিনিয়োগ করতে পারছিলেন না। তবে এবার বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক খবর সামনে এসেছে। সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমা তুলে দেওয়ার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে সরকার।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিকমেনডেশন’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এ তথ্য জানান। সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের পথ সুগম করতে এবং দেশের Bond Market বা বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। আজকের আর্টিকেলে আমরা এই নতুন সিদ্ধান্তের খুঁটিনাটি, এর প্রভাব এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এর সুবিধাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা

দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন যেন সঞ্চয়পত্রের ওপর আরোপিত নানা বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। বিশেষ করে একক ও যৌথ নামে কেনার যে সর্বোচ্চ সীমা বা Investment Limit বেধে দেওয়া হয়েছিল, তা অনেকের জন্য অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে অর্থসচিবের বক্তব্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

সেমিনারে অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার স্পষ্ট করে বলেন যে, সঞ্চয়পত্র কেনাবেচার বিষয়টি নিয়ে সরকার নতুন করে ভাবছে। তিনি উল্লেখ করেন, “সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে সীমা তুলে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।” এর মানে হলো, যদি এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়, তবে একজন নাগরিক তার ইচ্ছেমতো অংকের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারবেন, যা বর্তমানে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ।

বর্তমান নিয়ম বনাম সম্ভাব্য পরিবর্তন

বর্তমানে একজন ব্যক্তি একক নামে বা যৌথ নামে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন না। যেমন, পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র বা তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সিলিং বা ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে। এছাড়া সব মিলিয়েও একটি নির্দিষ্ট অংকের বেশি বিনিয়োগ করা যায় না।

সরকার যদি এই সীমা তুলে নেয়, তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। নিচে বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি ধারণা দেওয়া হলো:

  • বর্তমান অবস্থা: ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠোর বিনিয়োগ সীমা রয়েছে। নির্দিষ্ট সীমার পর বিনিয়োগ করলে মুনাফার হার কমে যায়।
  • সম্ভাব্য পরিবর্তন: বিনিয়োগের কোনো ঊর্ধ্বসীমা থাকবে না। মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ নিরাপদে সরকারি খাতে জমা রাখতে পারবেন।

বন্ড মার্কেট ও অর্থনৈতিক সংস্কার

এই সেমিনারে শুধুমাত্র সঞ্চয়পত্র নয়, বরং দেশের সামগ্রিক Financial Sector বা আর্থিক খাত এবং বন্ড মার্কেট নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি বন্ড বাজারের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, যদি বন্ডের লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ করা যায়, তবে বাংলাদেশে বন্ডের বাজার ৬ ট্রিলিয়ন বা ৬ লাখ কোটি টাকা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গেম চেঞ্জার হতে পারে। বর্তমানে দেশের বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূলধনের জন্য মূলত ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট তৈরি হলে এই নির্ভরশীলতা কমবে।

ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমানো

ড. আহসান এইচ মনসুর আরও উল্লেখ করেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত ব্যাংক ঋণের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বন্ড মার্কেটে অন্তর্ভুক্ত হওয়া। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমবে এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। প্রয়োজনে বিদেশি বিনিয়োগ বা Foreign Investment আনার দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

একটি দেশের অর্থনীতি যখন বড় হয়, তখন শুধুমাত্র ব্যাংক ঋণের ওপর ভিত্তি করে শিল্পায়ন বা বড় প্রকল্প চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। উন্নত বিশ্বে বন্ড মার্কেট বা শেয়ার মার্কেট থেকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশেও সেই চর্চা শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন গভর্নর।

মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের সম্পর্ক

বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Inflation বা মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বন্ড বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং সুদের হারের ওপর। তিনি মনে করেন, যদি সুদের হার একটি একক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা যায়, তবেই বন্ড মার্কেট টেকসই হবে।

সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ হলো, যখন মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এবং সুদের হার স্থিতিশীল হবে, তখন সঞ্চয়পত্র বা বন্ডে বিনিয়োগ করা আরও লাভজনক ও নিরাপদ হবে। সরকার চাইছে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে যেখানে মানুষ নির্দ্বিধায় টাকা খাটাতে পারবে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লাভ কী?

সরকার যদি সত্যিই সঞ্চয়পত্রের সীমা তুলে দেয়, তবে সাধারণ মানুষের লাভ কী হবে? এটি একটি বড় প্রশ্ন। আসুন পয়েন্ট আকারে দেখে নিই এর সম্ভাব্য সুবিধাগুলো:

  • ১. নিরাপদ বিনিয়োগ: শেয়ার বাজারের অস্থিরতা বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতের চেয়ে সরকারি সঞ্চয়পত্র অনেক বেশি নিরাপদ। সীমা উঠে গেলে মানুষ নিশ্চিন্তে বেশি টাকা এখানে রাখতে পারবে।
  • ২. সামাজিক নিরাপত্তা: বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং নারীরা, যারা সংসার চালানোর জন্য সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করেন, তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
  • ৩. কালো টাকা রোধ: ব্যাংকিং চ্যানেলে বা সঞ্চয়পত্রে টাকা বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে মানুষ ঘরে অলস টাকা ফেলে রাখবে না, যা পরোক্ষভাবে অর্থনীতিকে সচল রাখে।
  • ৪. ফিক্সড ইনকাম: প্রতি মাসে বা তিন মাস অন্তর নিশ্চিত মুনাফা পাওয়ার নিশ্চয়তা একমাত্র সঞ্চয়পত্রেই পাওয়া যায়।

সঞ্চয়পত্র বনাম অন্যান্য বিনিয়োগ মাধ্যম

অনেকেই জানতে চান, সীমা উঠে গেলে কি সঞ্চয়পত্রই সেরা মাধ্যম হবে? চলুন একটি তুলনামূলক ছক দেখি যা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

বৈশিষ্টসঞ্চয়পত্র (Sanchaypatra)ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট (FDR)শেয়ার বাজার (Stock Market)
ঝুঁকিনেই (সরকারি গ্যারান্টি)কম (ব্যাংক ভেদে ভিন্ন)অনেক বেশি
মুনাফার হারতুলনামূলক বেশিবাজারের ওপর নির্ভরশীলঅনিশ্চিত
মেয়াদনির্দিষ্ট (৩/৫ বছর)বিভিন্ন মেয়াদীযেকোনো সময়
বিনিয়োগ সীমাবর্তমানে আছে (তুলে দেওয়ার ভাবনা)নেইনেই

এই ছক থেকে বোঝা যায়, যদি বিনিয়োগ সীমা তুলে দেওয়া হয়, তবে সঞ্চয়পত্র আবারও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনিয়োগ মাধ্যম হয়ে উঠবে।

নতুন নিয়মে কী কী চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে?

সরকার সীমা তুলে দেওয়ার কথা ভাবলেও এর কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন, সরকারের সুদের ব্যয় বেড়ে যাওয়া। সঞ্চয়পত্রে মানুষকে উচ্চ হারে সুদ দিতে হয়, যা সরকারের বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অতীতে আইএমএফ (IMF) এর শর্ত এবং সরকারের ব্যয় কমানোর নীতির কারণেই সঞ্চয়পত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, সরকার কীভাবে এই বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় করবে? অর্থসচিব বা গভর্নর এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না বললেও, ধারণা করা হচ্ছে বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সরকার এই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ, সরকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বন্ডের মাধ্যমে টাকা ধার নেবে এবং সেটি উন্নয়নমূলক কাজে লাগাবে।

প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)

বিনিয়োগকারীদের মনে এই নতুন ঘোষণা নিয়ে নানা প্রশ্ন জাগছে। নিচে বহুল জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:

সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা কি এখনই উঠে গেছে?

না, অর্থসচিব জানিয়েছেন যে সরকার এটি নিয়ে “ভাবছে”। এখনো চূড়ান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। তবে এটি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।

সীমা উঠে গেলে কি মুনাফার হার কমবে?

এ বিষয়ে এখনো কিছু বলা হয়নি। সাধারণত সীমা বাড়লে বা তুলে দিলে মুনাফার হারের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে, তবে বন্ড মার্কেটের উন্নয়নের সাথে সমন্বয় করে সরকার হয়তো আকর্ষণীয় হার বজায় রাখার চেষ্টা করবে।

বর্তমানে কারা সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন?

বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক, পেনশনার, এবং মহিলারা নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। নতুন নিয়মেও এই যোগ্যতা একই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্ড এবং সঞ্চয়পত্রের মধ্যে পার্থক্য কী?

সঞ্চয়পত্র হলো সরকারের একটি নির্দিষ্ট স্কিম যা সাধারণ মানুষের জন্য। আর বন্ড হলো একটি ঋণপত্র যা সরকার বা কোম্পানি ইস্যু করে। বন্ড সাধারণত শেয়ার মার্কেটে কেনাবেচা করা যায়, কিন্তু সঞ্চয়পত্র হস্তান্তরযোগ্য নয়।

প্রবাসীরা কি এই সুবিধা পাবেন?

বর্তমানে প্রবাসীদের জন্য আলাদা বন্ড রয়েছে। তবে সঞ্চয়পত্রের সীমা উঠে গেলে প্রবাসীরাও উপকৃত হতে পারেন যদি তারা দেশি মুদ্রায় বিনিয়োগ করতে চান।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা তুলে দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ভাবনা নিঃসন্দেহে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্বস্তির খবর। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনের ব্যয়ভার বেড়ে যাওয়ার এই সময়ে মানুষ চায় তাদের সঞ্চিত অর্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং ভালো রিটার্ন। অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে।

বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন এবং সঞ্চয়পত্রের সীমা প্রত্যাহার এই দুই সিদ্ধান্ত যদি একসাথে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। এখন দেখার বিষয়, কবে নাগাদ এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের উচিত এই বিষয়ে পরবর্তী সরকারি নির্দেশনার দিকে নজর রাখা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button