টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়ছে চাপ
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তির দিকে যাচ্ছে। টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে। এর আগে নভেম্বর মাসেও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছিল। মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, সংসার চালানো কঠিন হয় এবং সীমিত আয়ের মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি হয়। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
মূল্যস্ফীতির সহজ ব্যাখ্যা
মূল্যস্ফীতি বলতে বোঝায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য ও সেবার গড় দাম বাড়া। একই আয়ে আগের মতো পণ্য কেনা যায় না। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতি যত বাড়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় তত বেড়ে যায়।
কেন মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
মূল্যস্ফীতি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত। চাল, ডাল, তেল, সবজি, ভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা খরচ সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে। আয় না বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যায়।
ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নভেম্বর মাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরেই ঘোরাফেরা করছে। মাঝেমধ্যে কিছুটা কমলেও আবার বাড়ছে। এতে বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি
খাদ্য মূল্যস্ফীতির অবস্থা
ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। টানা তিন মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল, ডিম, পেঁয়াজ ও সবজির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগছে।
খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি
খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। ডিসেম্বর মাসে এই হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। বাসাভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পোশাক খাতে খরচ বাড়ছে।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি
গত তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষের সঞ্চয় কমে যায় এবং অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে।
মূল্যস্ফীতি কীভাবে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে
মূল্যস্ফীতি অনেকটা নীরব করের মতো কাজ করে। আয় একই থাকলেও খরচ বাড়ে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে বা প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেয়।
প্রকৃত আয় কমে যাওয়া
যদি মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হয়, তাহলে প্রকৃত আয় কমে যায়। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।
জীবনযাত্রার মানে প্রভাব
খাবারের মান কমানো, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া, শিক্ষা খরচ কমানো—এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় পরিবারগুলো।
মূল্যস্ফীতি কমা মানে কি দাম কমা
অনেকেই মনে করেন মূল্যস্ফীতি কমলে দাম কমে যায়। বাস্তবে তা নয়। মূল্যস্ফীতি কমা মানে দাম বাড়ার গতি কমা, দাম কমা নয়।
সহজ উদাহরণ
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১০০ টাকায় যে পণ্য কেনা যেত, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ হলে একই পণ্য কিনতে লাগবে ১০৮ টাকা ৪৯ পয়সা।
সংসার খরচে মূল্যস্ফীতির প্রভাব
ধরা যাক, কোনো পরিবারের এক বছর আগে মাসিক খরচ ছিল ১ লাখ টাকা। মূল্যস্ফীতির কারণে এই খরচ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ৪৯০ টাকায়। এটি গড় হিসাব। বাস্তবে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য চাপ আরও বেশি।
কেন মূল্যস্ফীতি এখন বড় চ্যালেঞ্জ
গত দুই-তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সুদের হার বৃদ্ধি
সুদের হার বাড়িয়ে বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
শুল্ক ও কর কমানো
তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যে শুল্ক ও কর কমানো হয়েছে।
আমদানি স্বাভাবিক রাখা
নিত্যপণ্যের আমদানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমাতে আরও কী করা যেতে পারে
- বাজার তদারকি জোরদার
- সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা
- কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো
- কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর উদ্যোগ
প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)
মূল্যস্ফীতি কেন বাড়ছে
মূল্যস্ফীতি বাড়ছে মূলত উৎপাদন খরচ, আমদানি ব্যয় এবং বাজারে সরবরাহ সমস্যার কারণে।
মূল্যস্ফীতি কমলে কি জীবনযাত্রা সহজ হবে
মূল্যস্ফীতি কমলে খরচ বাড়ার গতি কমবে, তবে দাম কমবে না।
সবচেয়ে বেশি কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়
গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। মূল্যস্ফীতির প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ছে। আয় বাড়ার তুলনায় খরচ বাড়ায় মানুষ চাপের মধ্যে আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। না হলে সামনে দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।



