ব্যাংক

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা ও গ্রাহক আস্থার চিত্র

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালুর পরপরই বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। নতুন এই ব্যাংক নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক বা চাপ তৈরি হয়নি, বরং প্রথম দুই দিনের লেনদেন পরিসংখ্যান গ্রাহক আস্থারই প্রতিফলন দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়ার শুরুতেই আমানত ও উত্তোলনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রয়েছে। এটি দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে একটি শক্ত ভিত্তির ব্যাংক তৈরি করা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে শুরুর তথ্য বলছে যাত্রাটি আশাব্যঞ্জক।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা ও গ্রাহক আস্থার চিত্র
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা ও গ্রাহক আস্থার চিত্র

একীভূত পাঁচ ব্যাংক ও নতুন কাঠামো

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বেসরকারি খাতের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এই ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। একীভূত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই পাঁচ ব্যাংকের দায়, সম্পদ এবং জনবল নতুন ব্যাংকের অধীনে এসেছে।

গত পয়লা জানুয়ারি থেকে ব্যাংকগুলোর শাখায় নতুন নামফলক হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক লেখা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের ব্যাংকগুলোর সাইনবোর্ডও সাময়িকভাবে রাখা হয়েছে, যাতে গ্রাহকদের বিভ্রান্তি না হয়। সব শাখায় স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং গ্রাহকেরা নিয়মিত লেনদেন করতে পারছেন।

প্রথম দুই দিনের লেনদেনের চিত্র

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালুর পর ১ ও ৪ জানুয়ারি মোট ১৩ হাজার ৩১৪টি হিসাব থেকে ১০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই সময়ে নতুন আমানত জমা পড়েছে ৪৪ কোটি টাকা। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এই তথ্যকে গ্রাহক আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহকেরা সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছেন। প্রায় ৬ হাজার ২৬৫ জন গ্রাহক ৬৬ কোটি টাকার মতো অর্থ তুলেছেন। তবে এই উত্তোলনকে অস্বাভাবিক বলা হচ্ছে না, কারণ গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা ও রেজল্যুশন স্কিম

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ইতিমধ্যে একটি রেজল্যুশন স্কিম জারি করেছে। এই স্কিম অনুসারেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এই স্কিমের মূল উদ্দেশ্য।

রেজল্যুশন স্কিমের আওতায় ব্যাংকের লেনদেন, ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। ফলে গ্রাহকেরা জানতে পারছেন, তাদের টাকা নিরাপদ আছে এবং নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা তারা পাবেন।

নতুন বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য নতুন বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিকভাবে সরকারি প্রতিনিধিদের দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী বোর্ড গঠন করা হয়েছে। খুব শিগগিরই স্বতন্ত্র পরিচালক যুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর।

বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিচালনা পর্ষদ তৈরি করা, যারা ব্যাংকটিকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ও স্থিতিশীল করতে পারবে।

আইটি সিস্টেম ও ফরেনসিক নিরীক্ষার চ্যালেঞ্জ

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমটি হলো পাঁচটি ব্যাংকের জন্য একটি সমন্বিত আইটি সিস্টেম চালু করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি টিম ইতিমধ্যে এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। সমন্বিত আইটি সিস্টেম চালু হলে লেনদেন আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে।

দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতীত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক নিরীক্ষা। এই নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে, কীভাবে টাকা সরানো হয়েছে, কোন কোন হিসাবে গেছে এবং কারা এর সুবিধাভোগী। ফরেনসিক রিপোর্টের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনিয়মের দায় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পাঁচ ব্যাংকের দুরবস্থার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু ব্যাংক কর্মকর্তা নয়, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কেউ জড়িত থাকলেও বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে।

আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলবে। একই সঙ্গে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা যেন নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সে বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে।

কর্মীদের বেতন কাঠামো ও মানবসম্পদ

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের বেতন সরকারি স্কেলে হবে না। বরং একটি সমন্বিত বেসরকারি বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। এতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং নতুন প্রতিভা আকর্ষণ করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কর্মদক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নত হবে এবং সেবার মান বাড়বে।

মুনাফার হার ও নতুন শরিয়াহভিত্তিক পণ্য

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মুনাফার হার শরিয়াহভিত্তিক এবং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান পণ্যগুলো একীভূত করার পাশাপাশি নতুন নতুন শরিয়াহসম্মত পণ্য চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন বিনিয়োগ পণ্য ও সেবার মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকের আয় বাড়বে এবং গ্রাহকেরাও আরও ভালো সেবা পাবেন।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও বেসরকারিকরণ পরিকল্পনা

সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী তিন বছরের মধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এরপর কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনা বা আইপিওর মাধ্যমে ব্যাংকটিকে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক খাতে সরকারের প্রত্যক্ষ চাপ কমবে এবং বাজারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রসঙ্গ

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আরও জানান, ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ মূল্যায়ন করে ব্যক্তিগত আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রোজার আগেই ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সরকার যে অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা দিয়ে পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উপসংহার

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। শুরুর দিনগুলোতে লেনদেনের চিত্র এবং গ্রাহক আস্থা ইতিবাচক হওয়ায় এই উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। যদিও আইটি সমন্বয়, ফরেনসিক নিরীক্ষা এবং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। এই যাত্রা সফল হলে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন মানদণ্ড স্থাপিত হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button