ব্যাংক

গ্রাহকের হিসাবে রেমিট্যান্স জমার নির্দেশ এক–দুই দিনের মধ্যে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা remittance অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, পারিবারিক ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে remittance প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসী আয় বা remittance দ্রুত গ্রাহকের হিসাবে জমা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নির্দেশনা দিয়েছে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশ থেকে আসা remittance একই দিন বা পরবর্তী কর্মদিবসে গ্রাহকের হিসাবে জমা দিতে হবে। ফলে প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায় গতি, স্বচ্ছতা ও আস্থা আরও বাড়বে।

আজ জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক এ নির্দেশনা কার্যকর করেছে। নির্দেশনাটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হলেও ব্যাংকগুলোকে পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং খাতে একটি বড় সংস্কার হিসেবেই দেখা হচ্ছে, কারণ এতে remittance ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের জটিলতা অনেকটাই কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার মূল দিক

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন সিদ্ধান্তের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসী আয় বা remittance গ্রাহকের কাছে দ্রুত পৌঁছানো নিশ্চিত করা। এতে করে প্রবাসী কর্মীরা যেমন উৎসাহিত হবেন, তেমনি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে remittance পাঠানোর প্রবণতাও বাড়বে।

একই দিন বা পরদিন জমা বাধ্যতামূলক

নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলোকে ইনওয়ার্ড remittance বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহককে জানাতে হবে। ব্যাংকিং সময়ের মধ্যে remittance এলে একই কর্মদিবসে গ্রাহকের হিসাবে জমা দিতে হবে। আর ব্যাংকিং সময়ের পরে remittance এলে পরবর্তী কর্মদিবসে তা জমা নিশ্চিত করতে হবে। এতে গ্রাহককে আর দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হবে না।

গ্রাহককে তাৎক্ষণিক জানানো

নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, নিরাপদ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে remittance আসার খবর গ্রাহককে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে হবে। এসএমএস, অ্যাপ নোটিফিকেশন বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে এই তথ্য জানানো যাবে। এর ফলে গ্রাহক তার প্রবাসী আয় সম্পর্কে দ্রুত জানতে পারবেন এবং অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা সহজ হবে।

দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের নতুন পদ্ধতি

বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু সময়সীমা বেঁধে দেয়নি, বরং remittance প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করার জন্য আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছে।

স্ট্রেইট-থ্রু প্রসেসিং ব্যবহারের পরামর্শ

ব্যাংকগুলোকে স্ট্রেইট-থ্রু প্রসেসিং বা এসটিপি পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই ও লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। ফলে মানবিক হস্তক্ষেপ কমে যায় এবং remittance জমা দিতে সময়ও কম লাগে।

ঝুঁকিভিত্তিক দ্রুততর যাচাই

প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গেলে কিছু নথি বা যাচাই প্রক্রিয়া বাকি থাকলেও গ্রাহকের হিসাবে remittance জমা দেওয়া যাবে। পরে বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা যাবে। এতে করে জরুরি প্রয়োজনে গ্রাহক দ্রুত অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।

বিশেষ ক্ষেত্রে যাচাই প্রক্রিয়া

সব ক্ষেত্রেই পোস্ট-ক্রেডিট রিভিউ সম্ভব নাও হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, গ্রাহকের হিসাবে অর্থ জমা দেওয়ার আগে যাচাই সম্পন্ন করতে হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়া তিন কর্মদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে। এর ফলে নিরাপত্তা বজায় রেখে দ্রুত remittance নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।

পেমেন্ট ট্র্যাকিং ও স্বচ্ছতা

নতুন নির্দেশনায় পেমেন্ট ট্র্যাকিং ও স্বচ্ছতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। remittance গ্রহণ থেকে শুরু করে গ্রাহকের হিসাবে জমা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করার জন্য ইউনিক এন্ড-টু-এন্ড ট্রানজেকশন রেফারেন্স বা ইউটিআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ইউনিক ট্রানজেকশন রেফারেন্সের গুরুত্ব

এই রেফারেন্স নম্বরের মাধ্যমে প্রতিটি remittance কোথায় আছে, কোন ধাপে রয়েছে, তা সহজেই ট্র্যাক করা যাবে। এতে করে গ্রাহক ও ব্যাংক উভয় পক্ষের জন্য স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভুল বা জালিয়াতির আশঙ্কা কমবে।

ডিজিটাল বৈদেশিক মুদ্রা প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালীকরণ

বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল বৈদেশিক মুদ্রা প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালী করার কথাও বলেছে। এর ফলে ফরম সি এবং ফরম সি (আইসিটি) সংক্রান্ত বাড়তি ঝামেলা ধীরে ধীরে কমে আসবে। এতে ব্যাংকিং কার্যক্রম আরও সহজ হবে।

ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক প্রভাব

এই নির্দেশনার ফলে ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

করেসপনডেন্ট ব্যাংকের আস্থা বৃদ্ধি

ঢাকায় কর্মরত একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের ফলে করেসপনডেন্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা বাড়বে। বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে।

প্রবাসীদের উৎসাহ বৃদ্ধি

যখন প্রবাসীরা দেখবেন যে তাদের পাঠানো remittance দ্রুত ও নিরাপদভাবে পরিবারের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তখন তারা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল বাদ দিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলেই অর্থ পাঠাতে আগ্রহী হবেন। এতে করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়বে।

প্রবাসী আয় ও অর্থনীতিতে প্রভাব

প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। দ্রুত remittance জমা নিশ্চিত হলে এর প্রভাব বহুমুখী হবে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে

ব্যাংকিং চ্যানেলে remittance বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে। এটি আমদানি ব্যয় মেটানো ও মুদ্রা বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।

গ্রাহকের আর্থিক নিরাপত্তা

দ্রুত জমা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কারণে গ্রাহকের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়বে। অর্থ আটকে থাকার ঝুঁকি কমবে এবং আর্থিক পরিকল্পনা করা সহজ হবে।

প্রশ্ন-উত্তর

প্রবাসী আয় বা remittance কত দিনে জমা হবে?

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকিং সময়ের মধ্যে এলে একই দিন এবং ব্যাংকিং সময়ের পরে এলে পরবর্তী কর্মদিবসে জমা হবে।

গ্রাহককে কীভাবে জানানো হবে?

নিরাপদ ইলেকট্রনিক মাধ্যমে যেমন এসএমএস বা অ্যাপ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে গ্রাহককে জানানো হবে।

সব ক্ষেত্রে কি আগে যাচাই হবে?

না, কিছু ক্ষেত্রে পরে যাচাই করা যাবে। তবে যেখানে সম্ভব নয়, সেখানে তিন কর্মদিবসের মধ্যে যাচাই শেষ করতে হবে।

এই নির্দেশনা কবে থেকে কার্যকর?

নির্দেশনাটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে, তবে পূর্ণ বাস্তবায়নের সময়সীমা ৩১ মার্চ পর্যন্ত।

শেষ কথা

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন নির্দেশনা প্রবাসী আয় বা remittance ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একই দিন বা পরবর্তী কর্মদিবসে remittance জমা নিশ্চিত হওয়ায় গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়বে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা তৈরি হবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই উদ্যোগ প্রবাসী ও দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button