গুলশানে সিটি ব্যাংকের নিজস্ব ভবন
ঢাকার গুলশানে City Bank Bangladesh–এর নিজস্ব ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১২০০ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগে গড়ে উঠতে যাচ্ছে এই আধুনিক ভবন, যা সিটি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুলশানে সিটি ব্যাংকের নিজস্ব ভবন নির্মাণ শুধু একটি স্থাপনা প্রকল্প নয়, এটি ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা, আস্থার জায়গা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের স্পষ্ট বার্তা দেয়। এই প্রতিবেদনে গুলশানে সিটি ব্যাংকের নিজস্ব ভবন নির্মাণের পেছনের কারণ, ব্যয় কাঠামো, অনুমোদন প্রক্রিয়া, ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

গুলশানে সিটি ব্যাংকের নিজস্ব ভবন প্রকল্প
ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে মোট ৪০ কাঠা জমির ওপর সিটি ব্যাংক নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে আগে থেকেই ব্যাংকের মালিকানায় থাকা ২০ কাঠা জমির পাশেই নতুন করে আরও ২০ কাঠা জমি কেনা হচ্ছে। এই জমির ওপর ২৮ তলা আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সব কার্যক্রম এক ছাদের নিচে পরিচালিত হবে।
জমির পরিমাণ ও অবস্থান
এই প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত জমিটি গুলশান–২ সংলগ্ন গুলশান অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থিত। এলাকাটি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে নিজস্ব ভবন থাকলে ব্যাংকটির প্রশাসনিক ও গ্রাহকসেবামূলক কার্যক্রম আরও সহজ হবে।
অনুমোদন প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা
সিটি ব্যাংকের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের অনুমোদন ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক থেকে ২৮ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক Bangladesh Bank ভবন নির্মাণ ও জমি কেনার বিষয়েও সম্মতি দিয়েছে।
পর্ষদ সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পর সিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকটির নিজস্ব ভবন নির্মাণের পথ পুরোপুরি সুগম হলো।
ব্যয় কাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা
এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নতুন করে ২০ কাঠা জমি কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ৩৪৫ কোটি টাকা। জমি কেনা, নিবন্ধন, কর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভবন নির্মাণে ব্যয়
আগের ২০ কাঠা এবং নতুন কেনা ২০ কাঠা জমি মিলিয়ে মোট ৪০ কাঠা জমির ওপর ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৫৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে জমি ও ভবন নির্মাণ খাতে সিটি ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা।
ভবনের নকশা ও ব্যবহার পরিকল্পনা
নির্মাণাধীন ভবনটি হবে ২৮ তলা বিশিষ্ট। এর মধ্যে ৫ তলা বরাদ্দ থাকবে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য। বাকি ২৩ তলায় সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ পরিচালিত হবে।
আধুনিক ও নান্দনিক স্থাপনা
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবনটি হবে আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। কর্মীদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা এবং গ্রাহকসেবাকে আরও কার্যকর করাই এর মূল লক্ষ্য।
সিটি ব্যাংকের বর্তমান কার্যক্রম
বর্তমানে সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম গুলশানের একটি ভাড়া ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় আগের ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং সাময়িকভাবে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
জনবল ও শাখা নেটওয়ার্ক
সিটি ব্যাংকের বর্তমানে কর্মীর সংখ্যা ৭১০০ জনের বেশি। দেশজুড়ে ব্যাংকটির রয়েছে ১৩৪টি শাখা এবং ৭০টি উপশাখা। নিজস্ব ভবন নির্মিত হলে এসব কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
আরও জানতে পারেনঃ অগ্রণী ব্যাংক একাউন্ট খোলার নিয়ম
সিটি ব্যাংকের ইতিহাস ও অগ্রযাত্রা
১৯৮৩ সালে দেশের ১২ জন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর উদ্যোগে সিটি ব্যাংক যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৬ সালে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। একসময় সমস্যাগ্রস্ত থাকলেও ধীরে ধীরে সিটি ব্যাংক নিজেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের কাতারে নিয়ে আসে।
নিজস্ব ভবনের প্রথম অভিজ্ঞতা
২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো সিটি ব্যাংক নিজস্ব ভবনে প্রধান কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করে। তবে জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন করে বড় পরিসরে ভবন নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়।
আর্থিক সক্ষমতা ও মুনাফার চিত্র
সিটি ব্যাংক বর্তমানে দেশের অন্যতম লাভজনক বেসরকারি ব্যাংক। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে প্রবেশ করে।
সাম্প্রতিক মুনাফা তথ্য
নিচের ছকে সাম্প্রতিক বছরের মুনাফার চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বছর | সমন্বিত মুনাফা (কোটি টাকা) |
|---|---|
| ২০২৩ | ৬৩৮ |
| ২০২৪ | ১০১৪ |
| ২০২৫ (৯ মাস) | ৭২২ |
এই প্রবৃদ্ধি ব্যাংকটির আর্থিক শক্তিমত্তার স্পষ্ট প্রমাণ।
অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা
দেশীয় ব্যাংকের মধ্যে হাজার কোটি টাকার মুনাফার ক্লাবে রয়েছে সিটি ব্যাংক ও BRAC Bank। ২০২৪ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা ছিল ১৪৩২ কোটি টাকা। সে হিসেবে মুনাফার দিক থেকে সিটি ব্যাংকের অবস্থান দ্বিতীয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লক্ষ্য
নিজস্ব ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সিটি ব্যাংক তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। আধুনিক অবকাঠামো, একীভূত কার্যক্রম এবং উন্নত কর্মপরিবেশ ব্যাংকটির সেবার মান আরও বাড়াবে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, বিশ্বমানের নান্দনিক ব্যাংক ভবনের উদাহরণ তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভবন নির্মাণ শেষ করে সেখানে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন
গুলশানে সিটি ব্যাংকের নিজস্ব ভবন নির্মাণে মোট ব্যয় কত?
মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা।
ভবনটি কত তলা হবে?
ভবনটি হবে ২৮ তলা বিশিষ্ট।
ভবন নির্মাণের অনুমোদন কারা দিয়েছে?
রাজউক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিয়েছে।
কবে নাগাদ ভবনটির কাজ শেষ হতে পারে?
নির্দিষ্ট সময় জানানো না হলেও দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শেষ কথা
গুলশানে সিটি ব্যাংকের নিজস্ব ভবন নির্মাণ দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১২০০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আধুনিক অবকাঠামো ও সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে সিটি ব্যাংক তার গ্রাহকসেবা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু সিটি ব্যাংকের নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।



