প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন সুবিধা: বিদেশ যাত্রা ও পুনর্বাসনে
বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার মোটা অংকের টাকা জোগাড় করা অনেকের জন্যই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। প্রবাসীদের এই আর্থিক সংকট দূর করতে এবং বিদেশ ফেরতদের দেশে স্বাবলম্বী করতে সরকারিভাবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। আপনি যদি সহজ শর্তে এবং কম সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যেতে চান অথবা দেশে এসে কোনো ব্যবসা করতে চান, তবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক হতে পারে আপনার সেরা ভরসা।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন কী?
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক মূলত প্রবাসী কর্মী এবং তাদের পরিবারের কল্যাণে নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক। এই ব্যাংকটি মূলত প্রবাসীদের বিদেশ যাত্রার খরচ মেটাতে এবং প্রবাস থেকে ফিরে আসা কর্মীদের দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। ৯% সহজ সুদে এই ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ঋণ গ্রহণ করা সম্ভব।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন সুবিধা ও ঋণের ধরন
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বেশ কয়েক ধরনের লোন স্কিম চালু রেখেছে। নিচে প্রধান লোনগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. অভিবাসন ঋণ (Migration Loan)
বিদেশে যাওয়ার জন্য যাদের অর্থের প্রয়োজন, তাদের জন্য এই লোনটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। ভিসা পাওয়ার পর টিকিট এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে এই লোন দেওয়া হয়। সাধারণত ১ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অভিবাসন ঋণ পাওয়া সম্ভব। এটি মূলত জামানতবিহীন বা সহজ জামানতে প্রদান করা হয়।
২. নারী অভিবাসী ঋণ
নারী কর্মীদের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের নারী কর্মীরা যারা গৃহকর্মী বা অন্যান্য পেশায় বিদেশে যেতে চান, তারা কোনো সুদমুক্ত বা অত্যন্ত স্বল্প সুদে এই ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকেন। নারী অভিবাসীদের জন্য এটি একটি বিশেষ সুযোগ।
৩. পুনর্বাসন ঋণ (Rehabilitation Loan)
বিদেশে কয়েক বছর কাজ করার পর অনেকে দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে কিছু করতে চান। তাদের জন্য পুনর্বাসন ঋণ অত্যন্ত কার্যকর। দেশে ফিরে ডেইরি ফার্ম, মৎস্য চাষ বা ছোট ব্যবসা করার জন্য এই ঋণ নেওয়া যায়। এতে করে প্রবাসীরা দেশে ফিরে বেকার না থেকে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন।
৪. বিশেষ দক্ষতা ও ভাষা শিক্ষা লোন
বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির জন্য কারিগরি দক্ষতা এবং ভাষাশিক্ষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ভাষা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। যারা জাপানি, কোরিয়ান বা অন্যান্য ভাষা শিখে দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে যেতে চান, তারা এই সুবিধা নিতে পারেন।
৫. এসএমই ও আত্মকর্মসংস্থান লোন
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকটি এসএমই লোন প্রদান করে। যারা ক্ষুদ্র শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান, তারা এই ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে পারেন।
৬. কৃষি ও গৃহ নির্মাণ ঋণ
প্রবাসীদের পরিবারের সচ্ছলতার জন্য কৃষি খাতে (যেমন: পোল্ট্রি, ডেইরি) বিনিয়োগ এবং নিজস্ব জমি থাকলে ঘর নির্মাণের জন্যও বিশেষ লোন দেওয়া হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন পাওয়ার যোগ্যতা
সবাই চাইলেই এই লোন পাবেন না, আবেদনকারীকে অবশ্যই নিচের যোগ্যতাগুলো পূরণ করতে হবে:
- আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
- বিদেশে যাওয়ার জন্য বৈধ পাসপোর্ট এবং ভিসা থাকতে হবে।
- বিএমইটি (BMET) থেকে দেওয়া স্মার্ট কার্ড বা ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স থাকতে হবে।
- আবেদনকারীর বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে।
- বিদেশের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজের চুক্তিপত্র (Labour Contract) থাকতে হবে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা
আবেদনের সময় আপনার কাছে কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট থাকতে হবে। এগুলো সঠিকভাবে জমা না দিলে লোন অনুমোদন হতে দেরি হতে পারে:
- আবেদনকারীর ছবি: ৩-৪ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- পরিচয়পত্র: ভোটার আইডি কার্ড বা এনআইডি (NID) কার্ডের ফটোকপি।
- পাসপোর্ট ও ভিসা: বৈধ পাসপোর্টের ফটোকপি এবং ভিসার কপি।
- স্মার্ট কার্ড: বিএমইটি (BMET) কর্তৃক স্মার্ট কার্ডের কপি।
- চুক্তিপত্র: বিদেশের কোম্পানির সাথে সম্পাদিত কাজের চুক্তিনামা।
- জামিনদার: লোন পরিশোধের নিশ্চয়তার জন্য একজন উপযুক্ত জামিনদার এবং তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (এনআইডি ও ছবি)।
লোন আবেদন করার সঠিক প্রক্রিয়া
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন সুবিধা গ্রহণ করার প্রক্রিয়াটি বেশ স্বচ্ছ এবং সহজ। নিচে ধাপগুলো দেওয়া হলো:
- নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ: প্রথমে আপনার জেলার নিকটস্থ প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করুন। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই এই ব্যাংকের শাখা রয়েছে।
- ফরম সংগ্রহ: ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট ঋণের আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন।
- ফরম পূরণ ও জমা: ফরমে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ঋণের উদ্দেশ্য এবং জামিনদারের তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন।
- ভেরিফিকেশন: আপনার দেওয়া তথ্য এবং কাগজপত্র ব্যাংক কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করবেন।
- ঋণ অনুমোদন: সবকিছু ঠিক থাকলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপনার লোন অনুমোদন করবে এবং সরাসরি আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেবে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোনের সুদের হার ও মেয়াদ
বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণের সুদের হার সাধারণত ৯%। তবে লোন ক্যাটাগরি এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এটি কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। ঋণের মেয়াদ সাধারণত ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা লোন পাওয়া যায়?
সাধারণত অভিবাসন এবং প্রশিক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোন পাওয়া যায়। তবে পুনর্বাসন বা বড় প্রকল্পের জন্য ঋণের পরিমাণ প্রকল্প ভেদে বাড়তে পারে।
জামিনদার হিসেবে কে থাকতে পারেন?
আবেদনকারীর বাবা, মা, ভাই বা কোনো সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জামিনদার হিসেবে থাকতে পারেন। জামিনদারকে অবশ্যই ঋণের দায়ভার গ্রহণে সক্ষম হতে হবে।
কত দিনে লোন পাওয়া যায়?
সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে এবং ভেরিফিকেশন দ্রুত শেষ হলে সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণের টাকা পাওয়া যায়।
লোন পরিশোধ না করলে কী হবে?
এটি একটি সরকারি লোন, তাই পরিশোধ না করলে আইনি জটিলতা হতে পারে এবং আপনার জামিনদারের ওপর দায়ভার বর্তাবে। এছাড়া ভবিষ্যতে পুনরায় লোন পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, যারা দালালের খপ্পরে না পড়ে বা চড়া সুদে এনজিও থেকে লোন না নিয়ে বিদেশ যেতে চান, তাদের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক লোন সুবিধা একটি আশীর্বাদ। এটি শুধু আপনাকে বিদেশ যেতে সাহায্য করে না, বরং বিদেশ থেকে ফিরে এসে দেশেই কিছু করার স্বপ্ন দেখায়। তাই সঠিক নিয়ম মেনে আবেদন করুন এবং আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুন।
সতর্কতা: ঋণের পরিমাণ, সুদের হার এবং নিয়মকানুন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। আবেদনের আগে সরাসরি ব্যাংকের শাখা থেকে বর্তমান নিয়ম জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।



