এনজিও

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন লোন ২০২৬ ও বিস্তারিত তথ্য

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে তারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান হলো শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন। আপনারা অনেকেই হয়ত শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন লোন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৫ সালের আপডেট তথ্য অনুযায়ী শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন লোন প্রোগ্রাম, সুদের হার, লোনের ধরণ এবং আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। যারা সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হতে চান, তাদের জন্য এই তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের পরিচিতি

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক ও অরাজনৈতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। ১৯৮৫ সালে যশোরে এই প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। সংস্থাটির নামের মধ্যেই এর মূল দর্শন নিহিত রয়েছে—”শিশুদের উন্নয়নের দিগন্তে আবাসনের উদ্ভব”। মূলত সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করাই এর প্রধান লক্ষ্য। ১৯৮৯ সাল থেকে নাসিমা বেগমের দক্ষ নেতৃত্বে সংস্থাটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মাইক্রোফাইনান্স বা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ১০টি জেলায় শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বিস্তৃত। প্রায় ৪৮৪ জন পূর্ণকালীন দক্ষ কর্মী নিয়ে সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) এর সকল নীতিমালা ও গাইডলাইন মেনে সংস্থাটি পরিচালিত হয়। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংস্থাটির সেভিংস বা সঞ্চয় স্থিতির পরিমাণ প্রায় ৮৬২ মিলিয়ন টাকা এবং এর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪৯,৬৫৮ জন। দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী করতে ১৯৯১ সাল থেকে তাদের লোন কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন লোনের ধরনসমূহ

গ্রাহকদের চাহিদা এবং আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ঋণ প্রদান করে থাকে। বর্তমানে তারা প্রায় ১৬টি লোন কম্পোনেন্ট অফার করছে। নিচে প্রধান কয়েকটি লোনের ধরণ আলোচনা করা হলো:

জাগরণ লোন

দরিদ্র মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে জাগরণ লোন চালু করা হয়। বর্তমানে ৯টি জেলায় এই কার্যক্রম চলছে। এই লোনের আওতায় শুধু অর্থায়নই নয়, বরং গ্রুপ গঠন, সঞ্চয় করার অভ্যাস এবং আয়-উৎপাদনমূলক কাজের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

অগ্রসর লোন

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৫ সালে অগ্রসর লোন কার্যক্রম শুরু হয়। এই লোনের মূল উদ্দেশ্য হলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ানো। যারা ছোট পরিসরে ব্যবসা করছেন কিন্তু পুঁজির অভাবে বড় করতে পারছেন না, তাদের জন্য এই লোনটি খুবই উপযোগী।

বুনিয়াদ লোন

সমাজের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে ২০০৪ সালে বুনিয়াদ লোন চালু করা হয়। বিশেষ করে দিনমজুর, বিধবা এবং নারী-প্রধান পরিবারের কথা মাথায় রেখে এই লোনটি ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে তারা চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

সুফলন লোন

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষকদের সহায়তার জন্য ২০১৪ সালে সুফলন লোন চালু হয়। কৃষকরা যাতে সময়মতো কৃষি উপকরণ যেমন—বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি কিনতে পারেন, সেজন্য এই মৌসুমি ঋণ প্রদান করা হয়। এটি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

অন্যান্য বিশেষ লোন

  • কেজিএফ লোন: ২০০৮ সাল থেকে চালু এই লোনটি কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য দেওয়া হয় এবং এর মেয়াদ সাধারণত ৬ মাস।
  • আইজিএ লোন: আয়-উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য এই ঋণ দেওয়া হয়, যার সর্বোচ্চ সার্ভিস চার্জ ২৪% (ক্রমহ্রাসমান)।
  • এসি লোন: সম্পদ সৃষ্টির জন্য এই লোন দেওয়া হয়, যার সিলিং ৩০,০০০ টাকা এবং সার্ভিস চার্জ ৮%।
  • এলআই লোন: জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য এই লোন দেওয়া হয়, যার সিলিং ১০,০০০ টাকা এবং সার্ভিস চার্জ ৮%।
  • অগ্রসর-এমডিপি: ক্লাস্টার-ভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য ১০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা।
  • কোভিড রিকভারি লোন: কোভিডে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়াতে এই বিশেষ ঋণ দেওয়া হয়।

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন লোনের বিস্তারিত তথ্য ও চার্ট

বিভিন্ন লোনের সীমা এবং চার্জ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে নিচের টেবিলটি দেখুন:

লোনের ধরনটার্গেট গ্রুপলোনের সিলিং (টাকা)সার্ভিস চার্জ (%)মেয়াদকাজের এরিয়া
জাগরণদরিদ্র জনগোষ্ঠীনির্দিষ্ট নয়নির্দিষ্ট নয়সাপ্তাহিক/মাসিক৯ জেলা
অগ্রসরউদ্যোক্তানির্দিষ্ট নয়নির্দিষ্ট নয়সাপ্তাহিক৯ জেলা
বুনিয়াদঅতি দরিদ্রনির্দিষ্ট নয়নির্দিষ্ট নয়সাপ্তাহিক৯ জেলা
সুফলনকৃষকনির্দিষ্ট নয়নির্দিষ্ট নয়মৌসুমীসব এরিয়া
আইজিএপরিবারের সদস্যনির্দিষ্ট নয়২৪ (ক্রমহ্রাসমান)নির্দিষ্ট নয়ঝিনাইদহ
এসিসম্পদ সৃষ্টি৩০,০০০নির্দিষ্ট নয়ঝিনাইদহ
এলআইজীবনমান উন্নয়ন১০,০০০নির্দিষ্ট নয়ঝিনাইদহ
অগ্রসর-এমডিপিক্লাস্টার উদ্যোক্তা১০,০০,০০০নির্দিষ্ট নয়নির্দিষ্ট নয়সব এরিয়া

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন লোনের যোগ্যতা ও আবেদন প্রক্রিয়া

ঋণ পাওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয় এবং সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

আবেদনের যোগ্যতা

  • নাগরিকত্ব: আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে।
  • আর্থিক অবস্থা: আবেদনকারী দরিদ্র বা অতি দরিদ্র পরিবারের সদস্য হতে হবে।
  • সদস্যপদ: সংস্থার নির্দিষ্ট গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেভিংস বা সঞ্চয় কার্যক্রমে নিয়মিত হতে হবে। সাধারণত একটি গ্রুপে ১০ থেকে ৩০ জন সদস্য থাকে।
  • প্রশিক্ষণ: আয়-উৎপাদনমূলক কাজের ওপর নূন্যতম প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
  • ঋণ খেলাপি: অন্য কোনো সংস্থা বা ব্যাংকে ঋণ খেলাপি থাকা যাবে না।
  • বয়স ও সক্ষমতা: আবেদনকারীকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক এবং শারীরিকভাবে কর্মক্ষম হতে হবে, যাতে তিনি ঋণ পরিশোধে সক্ষম হন।

আবেদন প্রক্রিয়া

আবেদন প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ এবং স্বচ্ছ। ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

  • ধাপ ১: আপনার নিকটস্থ শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের শাখায় যোগাযোগ করুন।
  • ধাপ ২: তাদের ফিল্ড অফিসারের সহায়তায় একটি গ্রুপে বা সমিতিতে সদস্য হিসেবে ভর্তি হন।
  • ধাপ ৩: নিয়মিত সাপ্তাহিক মিটিংয়ে উপস্থিত থাকুন এবং সঞ্চয় জমা দেওয়া শুরু করুন।
  • ধাপ ৪: নির্দিষ্ট সময় পর লোনের জন্য আবেদন ফর্ম পূরণ করুন।
  • ধাপ ৫: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন—জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং গ্রুপের সুপারিশ জমা দিন।
  • ধাপ ৬: সংস্থার কর্মীরা আপনার তথ্য যাচাই-বাছাই করে লোন অনুমোদন করবেন।

লোন অনুমোদনের পর আপনি টাকা হাতে পাবেন এবং সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে পারবেন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড বা কিস্তি শুরুর আগে কিছুটা সময় দেওয়া হয়।

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন লোনের সুবিধা এবং শর্তাবলী

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে দরিদ্র মানুষের জন্য এই লোন অনেক সুবিধা নিয়ে আসে।

সুবিধাসমূহ

  • সহজ শর্ত: জামানতবিহীন ঋণের সুবিধা পাওয়া যায়।
  • স্বল্প সুদের হার: কিছু কিছু লোন (যেমন এলআই, এসি) মাত্র ৮% সার্ভিস চার্জে দেওয়া হয়।
  • প্রশিক্ষণ: ঋণ গ্রহীতাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
  • মার্কেটিং সহায়তা: উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা হয়।
  • নারীর ক্ষমতায়ন: ঋণের প্রধান টার্গেট নারীরা হওয়ায়, এটি নারীদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করে।

শর্তাবলী

  • ঋণ গ্রহীতাকে অবশ্যই নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।
  • ঋণের টাকা শুধুমাত্র অনুমোদিত খাতেই ব্যয় করতে হবে।
  • সদস্য হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিয়মিত সঞ্চয় করতে হবে।

সফলতার গল্প এবং প্রভাব

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের লোন কার্যক্রম গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। হাজার হাজার পরিবার আজ দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, যশোরের এক নারী ‘বুনিয়াদ লোন’ নিয়ে একটি গাভী কিনেছিলেন। সেই গাভীর দুধ বিক্রি করে তিনি এখন স্বাবলম্বী এবং তার সন্তানেরা স্কুলে যাচ্ছে। আবার ‘অগ্রসর লোন’ নিয়ে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কলা চাষ করে নিজের ভাগ্য বদলেছেন।

এই লোন প্রোগ্রামগুলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মুক্তিই দেয়নি, বরং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে নারীরা এখন পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারছেন।

শেষ কথা

শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন লোন দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য একটি আশার আলো। সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিশ্রমের সাথে এই ঋণের টাকা কাজে লাগিয়ে যে কেউ নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন। আপনি যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হতে চান বা কৃষিকাজে পুঁজির অভাব বোধ করেন, তবে শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের সহায়তা নিতে পারেন। তবে ঋণ নেওয়ার আগে অবশ্যই আপনার পরিশোধের সক্ষমতা এবং সঠিক পরিকল্পনা যাচাই করে নেবেন। আশা করি, আজকের এই আর্টিকেলটি আপনাদের লোন সংক্রান্ত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ (FAQ)

লোন পেতে কত সময় লাগে?

গ্রুপে সদস্য হওয়ার পর এবং নিয়মিত সঞ্চয় শুরু করার সাধারণত ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে লোনের জন্য আবেদন করা যায় এবং যাচাই-বাছাই শেষে লোন পাওয়া যায়।

লোনের সুদের হার কত?

লোনের ধরণভেদে সার্ভিস চার্জ বা সুদের হার ভিন্ন হয়। এটি সাধারণত ৮% থেকে ২৪% (ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতি) পর্যন্ত হয়ে থাকে।

কোন কোন জেলায় এই লোন পাওয়া যায়?

যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোট ১০টি জেলায় সংস্থাটির কার্যক্রম রয়েছে। আপনার এলাকায় তাদের শাখা আছে কি না তা জেনে নিন।

নারীরা কি লোন পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান?

হ্যাঁ, শিশু নিলয় ফাউন্ডেশনের লোন কার্যক্রমে নারীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তাদের প্রধান টার্গেট গ্রুপই হলো সুবিধাবঞ্চিত নারীরা।

সেভিংস বা সঞ্চয় করা কেন জরুরি?

সঞ্চয় আপদকালীন সময়ে কাজে লাগে এবং এটি ঋণ পাওয়ার অন্যতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। নিয়মিত সঞ্চয়কারীকে সংস্থাটি বিশ্বাসযোগ্য গ্রাহক মনে করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button